পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২১

মাদরাসা শিক্ষকদের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী

সংযোগ নিউজ ডেস্ক: ইবতেদায়ি থেকে কামিল পর্যন্ত সকল মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
তিনি বলেন, আপনারা চাকরি জাতীয়করণের যে দাবি জানিয়েছেন সেটার সাথে আমি একমত। তবে এটা আমার হাতে নেই। আমি আপনাদের কর্মী হিসেবে, আপনাদের দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবো। আশা করি তিনি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে বিবেচনা করবেন। গতকাল (শনিবার) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদরাসা শিক্ষকদের ঐতিহাসিক মহাসম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। মাদরাসা শিক্ষকদের অরাজনৈতিক একক ও সর্ববৃৎহ সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন এই মহাসম্মেলনের আয়োজন করে।
সংগঠনের সভাপতি ও দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক আলহাজ্ব এ এম এম বাহাউদ্দীনের সভাপতিত্বে ও মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজীর সঞ্চালনায় মহাসম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। উদ্বোধক ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বেসরকারি খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা আলহাজ্ব সালমান এফ রহমান, ধর্ম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিএইচ হারুন, মাদরাসা ও কারিগরি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মোঃ আলমগীর, ফুলতলীর পীর সাহেব মাওলানা হুছাম উদ্দিন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোঃ আহসান উল্লাহ, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর একেএম ছায়েফ উল্লাহ প্রমুখ।
সম্মেলনে চাকরি জাতীয়করণের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবো আপনাদের হয়ে তাঁর সাথে কথা বলবো। আমি আপনাদের কর্মী, আপনাদের প্রতিনিধি। কর্মী হিসেবে আপনাদের বক্তব্য, সমাবেশ, কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেব। তাকে বিবেচনা করতে বলবো। তিনি দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আপনাদের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন। যেহেতু এটি শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়, এর সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অর্থের বিষয় আছে। তিনি সেগুলো আলোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবেচনায় নিবেন। তবে শিক্ষকদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সব সময় মাদরাসা শিক্ষা ও ইসলামী শিক্ষার প্রতি আন্তরিক। যার দৃষ্টান্ত আপনারা অতীতে পেয়েছেন, আগামীতেও পাবেন। গত নয় বছরে মাদরাসা ও ইসলামী শিক্ষার অগ্রগতির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এই সময়ে আমি আপনাদের কোন দাবির বিষয়ে ভুলে যায়নি। প্রধানমন্ত্রী সব সময় ইসলামী ও মাদরাসা শিক্ষার পক্ষে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনি ইসলাম ধর্মের প্রকৃত অনুসারি। তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে ওআইসির সদস্য করেছেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন, ইজতেমার জায়গা বরাদ্দ দিয়েছেন, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘কুরআন ও হাদিসের পরিপন্থি কোন আইন এদেশে হবে না’।
আগে বলা হতো মাদরাসা জঙ্গীবাদের কারখানা। আমি সবসময় বলেছি এখনো বলছি মাদরাসা জঙ্গীবাদের কারখানা নয়। বাস্তবে প্রমাণিতও হয়েছে। এরা মাদরাসা, স্কুল কিংবা কলেজের ছাত্র হতে পারে। শুধু মাদরাসায় হয় তা মটেই ঠিক নয়। বরং দেখা গেল উল্টোটা ঘটছে। যারা বড় লোকের ছেলে-মেয়ে, বড় বড় নামিদামি স্কুলে পড়ালেখা করে তারাই হলো এখন জঙ্গীবাদের আসল কারখানা। তবে একটা শ্রেণি ইসলামের নামকে ব্যবহার করে কুমন্ত্রণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিপথগামী করে। এজন্য আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই হামলার পর আমরা সমস্ত পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, দাখিল-আলিম মাদরাসার প্রিন্সিপাল, কামিল-ফাজিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও সকল কলেজের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে পৃথকভাবে সমাবেশ করে জঙ্গীবাদ সম্পর্কে সতর্ক থাকার কথা বলেছি। সব জায়গায় আলেমরা বক্তৃতা দিচ্ছেন, সবাই বলছেন যে না ইসলাম জঙ্গীবাদকে অনুমোদন করে না। আমরা সেই বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছি। সবাইকে বলেছি প্রত্যেক শিক্ষককে তাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি নজর রাখতে। অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে তাদের সন্তান যেন বিপথগামী না হয়। আমাদের ছেলে-মেয়েদের রক্ষা করতে হবে। কারণ ইসলাম কখনই জঙ্গীবাদকে অনুমোদন করে না। ইসলাম শান্তির ধর্ম, ন্যায়-নীতির ধর্ম, ইসলাম মানবতার ধর্ম। যারা জঙ্গীবাদে জড়াচ্ছে তারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা লাভ করেনি। বিভ্রান্ত হয়ে বলছে, বোমা মারলে, নিজেও মরলে বেহেস্তে চলে যাবে। কিন্তু যারা এসব কথা বলে পাঠায় তারা নিজেরা কিন্তু আত্মঘাতি হয়না। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে চায়। স্থিতিশীল দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চায়। যাতে বিদেশীরা জঙ্গীবাদের অজুহাতে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য না করে, আমাদের জনশক্তিকে তারা না নেয় এই চেষ্টা করা হচ্ছে।
দুর্নীতির বিষয়ে কোন ছাড় নাই উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশ এখন উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হচ্ছে, অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে, গড় আয়ু বাড়ছে, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমছে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সবদিক দিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতি আমাদের সমাজের বড় ব্যাধি। এতে জনগণের সম্পত্তি লুটপাট হয়, অপব্যবহার হয়। তিনি শিক্ষা পরিবারের সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই শিক্ষা পরিবার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলে দুর্নীতিকে দমন করতে হবে। শিক্ষা পরিবার থেকে দুর্নীতিকে একেবারে ঝাটিয়ে বিদায় করতে চায়। দুর্নীতির প্রতি আমাদের কোন ধরনের দুর্বলতা দেখানোর সুযোগ নাই। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সকলকে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
সমাবেশে এতো বিপুল সংখ্যক আলেম-ওলামার উপস্থিতি দেখে শিক্ষামন্ত্রী আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে বলেন, আজকে এখানে এতো আলেমের উপস্থিতির কারণে আল্লাহর রহমত আসবে। তিনি উপস্থিত আলেম-ওলামাদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের কাছে আমার একটা দাবি আছে, সেটা হলো আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন আমি যেন সৎ পথে, ন্যায়ের পথে ইসলামের পথে থেকে আপনাদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করবার জন্য সহিহ পথে কাজ করার তওফিক যেন আল্লাহ তাআলা দান করেন। নাহিদ বলেন, আমি একজন সাধারণ মানুষ। গরিব পরিবার থেকে এসেছি। আমি গোনাহগার বান্দা। কিন্তু ভাগ্যবান। কারণ দেশের বিপুল সংখ্যক আলেম সমাজের সাথে চলাফেরা করি। আমার ভাগ্য দিয়েছেন আল্লাহ আপনাদের মতো পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামাদের ভালোবাসা পেয়েছি। এরচেয়ে বড় পাওয়ার আর কিছু নেই।
এই সরকারের সময়ে মাদরাসা শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা তুরে ধরে নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর শিক্ষানীতি প্রণয়ন হয়েছে। এখানে মাদরাসা শিক্ষাকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি হবে ধর্মীয় শিক্ষা। আমরা ক্ষমতা গ্রহণের সময় শিক্ষকদের চাকরি ও বেতনে বৈষম্য ছিল। দাখিল-আলিম পর্যায়ের শিক্ষকরা এসএসসি-এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষকদের সমান বেতন-মর্যাদা পেতেন না। আমরা সেটা সমান করেছি। বেতন-মর্যাদা সমান দিয়েছি। সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশন করা হয়েছে। অধিদপ্তরের দাবি ছিল অনেক দিন ধরেই। আপনাদের দাবির প্রেক্ষিতে আলাদা মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর করা হয়েছে। মাদরাসা উন্নত করার জন্য ৩৫টি মাদরাসাকে মডেল মাদরাসা করেছি। ভবন-আইসিটি শিক্ষা, ল্যাবরেটরি, আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ৫১টি মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। এরফলে যারা আলেম হবেন তারা সারা বিশ্বে তাদের জায়গা করে নিতে পারবেন। বিগত সরকারের সমালোচনা করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এর আগে যারা সরকার ছিল তারা প্রচারণা চালিয়েছিল শেখ হাসিনাকে ভোট দিলে ইসলাম, মাদরাসা থাকবেনা। তাদের ঈমান দুর্বল। একজন মানুষ কিভাবে ইসলাম ধর্ম নষ্ট করে ফেলতে পারে। আল্লাহ যার হেফাজতকারী তা কে নষ্ট করবে। অথচ ওই সময় তারা একটা মাদরাসার ভবন করেননি। শেখ হাসিনা সরকার ইতোমধ্যে এক হাজার তিনশর বেশি মাদরাসার ভবন নির্মাণ করেছে। আরও ৯০টির মাদরাসার কার্যক্রম চলছে। দুই হাজার মাদরাসা ভবনের জন্য প্রকল্প একনেকে উপস্থাপন করেছি। পাস হলে এগুলোর কাজও চালু হবে। প্রত্যেকটা ভবনই হবে ৪ তলা বিশিষ্ট আধুনিক ভবন। এছাড়া শত বছরের বেশি সময় ধরে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি ছিল। শেখ হাসিনার কাছে এই দাবি জানানোর পর তিনি ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। কামিল-ফাজিল মাদরাসা এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মানের জন্য ৩০ একর জমি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ৪১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বাজেট অনুমোদনের জন্য পেস করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১৩ কোটি টাকা ইতোমধ্যে সরকার দিয়ে দিয়েছে। এই অর্থে একটি বিশ্বমানের ক্যাম্পাস নির্মান করা হবে। এটা হয়ে গেলে সেখানে ইসলামী শিক্ষা আরও ত্বরান্বিত হবে।
ইসলামী শিক্ষিতরা শুধু আলেম নয় সকল ক্ষেত্রে দক্ষ হবে এমন মন্তব্য করে নাহিদ বলেন, এখন লাখে লাখে আলেম তৈরি হচ্ছে। তারা শুধু সীমাবদ্ধ কিছু কাজ করবেন তার কোন সুযোগ নাই। তাদের সকল ক্ষেত্রে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। যদি তারা ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা লাভ না করে তাহলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসার হতে পারবে না। আধুনিক শিক্ষা না থাকলে আপনি ভাল আলেম হতে পারবেন কিন্তু ভাল অফিসার হতে পারবেন না। একজন ভালো আলেম যদি ভাল অফিসার হয় তাহলে তিনি দুর্নীতি করবেন না। এই পথ এতো দিন ছিল না। আমরা আধুনিক শিক্ষা সম্পৃক্ত করার ফলে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। মাদরাসায় এখন কম্পিউটার শিক্ষা, দাখিল-আলিম স্তরে বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা পড়ে তারা মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের বৃত্তি বাড়ানো হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এখন ইবতেদায়ীতে সাড়ে ৭ হাজার শিক্ষার্থীকে মেধা বৃত্তি এবং ১৫ হাজার সাধারণ বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এরফলে যারা মেধাবী তারা এই বৃত্তি সমানভাবে পাচ্ছে। আগামী বাজেটে ইবতেদায়ী থেকে ফাজিল পর্যন্ত বৃত্তির জন্য ৩৩ কোটি ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা পাস হলে আরও বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিতে পারবো।

Related posts

Leave a Reply

%d bloggers like this: